যে সংগ্রামের নাম শান্তি


কপিলবস্তু ছেড়ে আসেন সিদ্ধার্থ। ধন-সম্পত্তির মোহ, সিংহাসন ও সংসারের মায়া যখন তিনি ত্যাগ করেছেন, তখন তাঁর উদ্দেশ্য ছিল কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করা। এরপরে উরুবিল্ব গ্রামে নীরঞ্জরা নদীর কাছে আরও পাঁচ তপস্বীর সঙ্গে সাধনা শুরু করেন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৯। প্রায় ছয় বছর কঠোর তপস্যা চলে। অজন্তার ষোড়শ গুহায় এমনই এক দৃশ্যের ছবি রয়েছে, যেখানে দেখা যায়, সিদ্ধার্থ এসে দাঁড়িয়েছেন উরুবিল্ব গ্রামে (বর্তমানে বুদ্ধ গয়ার দক্ষিণে তদান্তীন উরইল) গ্রামপ্রান্তে, আর সঙ্গে দেখা যায় চারজনকে, এবং পাঁচজন নয় কেন, সেই ব্যাখ্যা নিয়ে শিল্প-ইতিহাসবিদদের মধ্যেও আলোচনা আছে।

ছয় বছরের এই কঠিন তপস্যা কেমন ছিল?

সাম্প্রতিক সময়ে, কম মনসংযোগ ও ত্রিশ সেকেন্ডের রিল দেখার ব্যস্ততার সময়ে, অন ট্যাপ ডেলিভারির সময়ে দাঁড়িয়ে তা ভাবা অসম্ভব! তবু যাঁরা এই তপস্যা করেছেন, এবং এক দিন নয়, দুই দিন নয়, দীর্ঘ বছর ধরে কঠিন অনুশীলনে ডুবে থেকেছেন, তাঁদের অধ্যবসায়কে মাথানত করে প্রণাম করা উচিত।

এই তপস্যার প্রধান শর্তগুলির মধ্যে ছিল অত্যন্ত সীমিত ভোজন। বৌদ্ধ ঐতিহ্য ও পরবর্তী বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়, সিদ্ধার্থ ও তাঁর সঙ্গীরা ভিক্ষা সংগ্রহ করে অল্প পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করতেন। কখনও দিনে একবার, কখনও আরও দীর্ঘ ব্যবধানে। পরবর্তী কাহিনিতে এমন প্রতীকী বর্ণনাও পাওয়া যায় যে খাদ্যগ্রহণ ক্রমশ এত কমে এসেছিল যেন তা প্রায় না খাওয়ার সমান—এক-একটি দানা অন্নের মতো উপমাও ব্যবহৃত হয়েছে। এই বর্ণনাগুলির উদ্দেশ্য ছিল শরীরের চরম সংযমকে বোঝানো।

তবে শুধু খাদ্যগ্রহণকেই এত কঠোর নিয়মে বাঁধেননি তাঁরা। এর সঙ্গে ছিল পোশাকের উপরে আরোপিত নিজস্ব বিধি, বাঁধা ছিল মরশুমকালীন কঠোরতাও। বিভিন্ন তপস্বী-পরম্পরার বর্ণনায় পাওয়া যায়, পরিত্যক্ত বা ফেলে দেওয়া কাপড় সংগ্রহ করে সেগুলি জুড়ে বস্ত্র তৈরি করে ব্যবহার করা হতো। ঠান্ডায় খোলা আকাশের নিচে থাকা, গরমে প্রখর রোদ সহ্য করা, নির্জন স্থানে অবস্থান করা, এসবও ছিল তপস্যার অংশ। কিছু ঐতিহ্যে শ্মশানসংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থান, মৃত্যুচিন্তা এবং দেহের অনিত্যতাকে স্মরণ করার অনুশীলনের কথাও উল্লেখ আছে। এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে কেউ কেউ নিজেদের চুল ও দাড়ি ছিঁড়ে সংযম পরীক্ষা করতেন।

একদিন নয়, দুদিন নয়, দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়ম, এই বিধি মেনে চলেছিলেন সিদ্ধার্থ। একেকটি দিন পার হয়েছিল, পার হয়েছিল ঋতুও। সিদ্ধার্থের বয়স ২৯ থেকে ৩৫ হয়েছিল। প্রায় না খেয়ে এতগুলো বছর এত কষ্ট করে থাকার জন্য তাঁর চেহারা হয়ে যায় জরাজীর্ণ, তাঁর পাঁজর বেরিয়ে আসে। পরবর্তী বৌদ্ধ শিল্পে এমনও চিত্রায়ণ দেখা যায় যে তাঁর শরীর এতটাই ক্ষীণ হয়েছিল যেন পেটে হাত রাখলে পিঠের স্পর্শ অনুভব করা যায়।শারীরিকভাবেও তিনি খুব দুর্বল হয়ে পড়েন, চলাফেরার তেমন শক্তিও আর দেহে ছিল না। কিন্তু এই ছয় বছর এত কঠোর তপস্যা করার পরেও যে সত্যের সন্ধান করছিলেন, তার সন্ধান পাননি সিদ্ধার্থ। তাই অনাহারক্লিষ্ট সন্ন্যাসী শেষে বোঝেন, শরীরকে অহেতুক নিপীড়ন করে কোনও লাভ নেই। মাত্রারিক্ত নিপীড়ন শরীরকে দুর্বল করে ও শরীর অশক্ত হয়ে পড়ে। তাই তিনি যে সত্যের সন্ধান করছেন, সেখানে দুটি চরম পথ তাঁকে ত্যাগ করে পরিমিতির পথ গ্রহণ করতে হবে।

এই সময়ে সিদ্ধার্থ খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছেন, যেন মৃত্যুকেও চোখের সামনে দেখতে পেয়েছেন তিনি। বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুযায়ী, এমনই এক সময়ে সিদ্ধার্থর প্রতি মায়া বর্ষণ করেন এক রমণী, তাঁর নাম সুজাতা। সেনানী-গোপকন্যা ছিলেন তিনি। পায়েস রান্না করে সিদ্ধার্থকে অর্পণ করেন। সিদ্ধার্থ সেই পায়েস গ্রহণ করেন এবং সুস্থবোধ করেন। অজন্তার ষোড়শ গুহাবিহারে এই ছবি দেখতে পাওয়া যায়, যে সুজাতা সিদ্ধার্থর সামনে মাটিতে বসে আছেন এবং তাঁর হাতে থালি। যদিও, এই ছবি খুঁজে পেতে আমাদের বেশ বিড়ম্বনা হয়েছিল, কারণ জরাজীর্ণ গুহাপ্রাচীরে শিল্পের কঙ্কাল বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছিল এই মানবসভ্যতা ঠিক কতটা বর্বর ও নিষ্ঠুর।

সুজাতার অর্পণ করা পায়েস গ্রহণের পরে তিনি অন্য এক গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেন। গয়ায় এক অশ্বত্থ গাছের নিচে পূর্ব দিকে মুখ করে পদ্মাসনে বসেন। এবং প্রতিজ্ঞা করেন—আমার হাড় ক্ষয়ে যাক, মাংসপেশি গলে যাক কিংবা রক্ত শুকিয়ে যাক, আমি ধ্যানভঙ্গ করব না। যে সত্যের সন্ধান আমি করছি, সেই সত্যের মুখোমুখি না হওয়া পর্যন্ত আমি তা খুঁজেই যাব।

দীর্ঘ ধ্যান ও সাধনার পর তিনি চার আর্য সত্য উপলব্ধি করেন—

দুঃখ আর্যসত্য—জীবনে দুঃখ ও অপূর্ণতা আছে।
দুঃখ সমুদয়— দুঃখের কারণ কী।
দুঃখ নিরোধ— দুঃখের অবসান সম্ভব।
দুঃখ নিরোধ মার্গ— অষ্টাঙ্গিক মার্গ।

সিদ্ধার্থ বোধিলাভ করেন এবং তিনি হন গৌতম বুদ্ধ।


বিশ্ব যোগদিবসের এক দিন আগে আজ এই কথাগুলি কেন লিখলাম? কারণ সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের জীবনে সাধনা, অধ্যবসায়ের মূল্য অতি ক্ষীণ, প্রায় নেই বললেই চলে। ধৈর্য কম। ক্ষমতার আস্ফালন মানুষের কাছে এখন প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। অন্যের প্রতি দ্বেষ, হিংসা, ক্রমাগত তুলনা করে চলা এবং অপেক্ষাকৃত দুর্বলের প্রতি চড়াও হওয়া... মানবজাতির হয়তো সবচেয়ে প্রিয় কাজ এটাই।

যদিও ভারতীয় দর্শনে যোগ আস্তিক দর্শনের অংশ, এবং বৌদ্ধ দর্শন ভারতীয় দর্শনের নাস্তিক শাখাগুলির একটি অর্থাৎ বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না। তাও আমি আজ সিদ্ধার্থ গৌতমের উদাহরণটি টানলাম। কারণ একটাই, তাঁর ত্যাগ ও তপস্যা।

ক্ষমতার লোভ তাঁকে বাঁধতে পারেনি। রাজ সিংহাসন ছেড়ে রাতারাতি তিনি বেরিয়ে আসেন। এবং এরপর ছয় বছর যে কঠিন তপস্যা করেন, তা কোনও সাধারণ মানবের পক্ষে সম্ভব নয়! এই কথা অস্বীকার করা যায় না যে, সাধনা-তপস্যা-অধ্যবসায় শেখা উচিত তাঁর থেকেই।

যোগও একটা সাধনা। কিছু মানুষ সারা জীবন ধরে এই সাধনা করেন, নিয়মিত অভ্যাস করেন। তাঁরা জানেন যোগ আসলে অন্তরের প্রশান্তি, ক্ষমতার আস্ফালন নয়। যোগের সঙ্গে যেমন দর্শন আছে, জড়িয়ে আছে নানা নিয়ম বিধিও। কিন্তু আমরা? কোনওটাই মানতে নারাজ। এখন মানব জীবনে শুধুই প্রতিশোধের আগুন, শক্তি প্রদর্শন, দম্ভের প্রকাশ। যোগকে সাধনা হিসেবে গ্রহণ করতে আমাদের ভালো লাগবে কেন?

এখন সবাই মনে করে পৃথিবী তাদের। এই পৃথিবীর জল, বাতাস, মাটি সব তাদের। জোর যার, মুলুক তার। কিন্তু এ যে ঋণ, তা বুঝতে পারে কি? মহাশূন্যে হয়তো ধূলিকণার মতো একটা গ্রহ, আর তাতে বসবাসকারী কয়েকটা জীব। তারা এতই বোকা যে মনে করে, তারাই সর্বশক্তিমান। তবে শক্তির প্রদর্শনের এই অশান্ত পরিবেশে আমি আশ্রয় নেব সেই মহীরুহের ছায়ায়। তাঁর দর্শন-সম্যক দৃষ্টি যেন আমার প্রধান অস্ত্র হয়, তাঁর ভাবনার প্রশান্তির বলয়ে আমি নিজেকে আবৃত রাখতে চাই। যে পথে হেঁটেছিলেন ২৯ বছরের সিদ্ধার্থ, সেই পথের কাঁটায় আমার পা’ও রক্তাক্ত হোক। আমি ও আমার অন্তর আমৃত্যু উচ্চারণ করব...’বুদ্ধং শরণম গচ্ছামি, ধম্মম শরণম গচ্ছামি।’

ছবি জিপিটিকে প্রম্পট দিয়ে বানিয়েছি।

Comments