বিশ্ব প্রকৃতি দিবসে-বুদ্ধ স্মরণে

বোধিলাভের পথে অশ্বত্থ গাছের নিচে তপস্যারত সিদ্ধার্থ। যে সত্যের সন্ধানে তিনি প্রায় ছয় বছর কঠিন তপস্যা করেছেন, হয়তো সেই সত্যের আলো সিদ্ধার্থকে ছোঁবে কয়েক মুহূর্ত পরই। এমনই এক সময়ে, উপস্থিত হলেন মার। বৌদ্ধ শাস্ত্রমতে অনঙ্গ-দেবতা।


প্রথমে ছদ্মবেশে সিদ্ধার্থর কাছে মিথ্যা বার্তা পৌঁছালেন। কিন্তু এই মিথ্যার জাল তথাগতকে বাঁধতে পারল না। শেষে তাই সংযম হারিয়ে আপন রূপে ফিরে এলেন মার। বললেন, সিদ্ধার্থ, কামনা-বাসনা এই পৃথিবীর মজ্জায় মজ্জায়। তাঁকে বোঝাতে চাইলেন যে, কামনা, ভয় ও ক্ষমতার মোহ থেকে মুক্তি অসম্ভব।
সিদ্ধার্থ সেই কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানালেন, "না, এই পৃথিবী ত্যাগের। কামনার জয়, বাসনার ক্ষয় আর ইন্দ্রিয়ের সংযমই এই পৃথিবীর চরম লক্ষ্য।"
মার প্রমাণ চাইলেন, বললেন, "কে তোমার সাক্ষী?"
সিদ্ধার্থ তাঁর ডান হাতের করাঙ্গুলি দিয়ে স্পর্শ করলেন মেদিনীকে। বললেন, স্বয়ং পৃথিবীই আমার সাক্ষী! বুদ্ধের এই মুদ্রাই 'ভূমিস্পর্শ মুদ্রা' নামে পরিচিত।
অজন্তার প্রথম গুহা-বিহারে পশ্মিম দিকের প্রাচীরে এমনই এক চিত্র দেখতে পাওয়া যায়... ধ্যানরত সিদ্ধার্থকে সসৈন্য 'মার' আক্রমণ করেছে। একইভাবে মারের তিন লাস্যময়ী কন্যা সিদ্ধার্থের চিত্তজয়ের চেষ্টা করছেন। ছবিটি দেখে মনে হয়, চারদিকে কাম, লোভ, ভয়...কিন্তু শান্ত সিদ্ধার্থ ভূমিস্পর্শ মুদ্রায়।
বৌদ্ধ দর্শনে মার কেবল এক দেবতা নন; তিনি মানুষের অন্তরের লোভ, ভয়, মোহ ও অহংকারের প্রতীক। ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় বসে সিদ্ধার্থ যেন ঘোষণা করেছিলেন, এই সমস্ত অন্ধকারের উপর জয় সম্ভব। তাঁর সেই মুহূর্তে সাক্ষী রেখেছিলেন এই পৃথিবীকে।
অজন্তার ২৬ নম্বর গুহায় এই একই দৃশ্য পাথরের গায়ে খোদাই করা রয়েছে। সিদ্ধার্থের ভূমিস্পর্শ মুদ্রায় মূর্তি অজন্তায়, সারনাথে, নালন্দা, মথুরা সহ একাধিক সংগ্রহশালায় দেখা যায়।
আজ বিশ্ব প্রকৃতি দিবসে, এটুকুই প্রার্থনা যে, ভয়, লোভ, বাসনার নাগপাশ আমায় বাঁধতে চাইলেও, আমার আত্মা যেন অবিচল না হয়, আমি যেন ভূমি ছুঁয়ে থাকি। প্রকৃতির শিক্ষা আমাকে আলোকিত করুক।
ছবিটি জেমিনাই দিয়ে এনহ্যান্স করানো।

Comments