অধিকার কার বেশি? হত্যাকারীর নাকি প্রাণরক্ষাকারীর?

বিগত কয়েক বছরে আমাকে গৌতম বুদ্ধের দর্শন ও জীবনী আমাকে ভাবিয়েছে। তাঁকে নিয়ে তাই একটু চর্চা আমি করি। কিছু পড়াশোনা, সেসবকে আত্মস্থ করা এবং জীবন দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। আজ সাম্প্রতিক সময়ে একটি প্রচলিত কাহিনির কথা মনে পড়ছে। হীনযান ও মহাযান, দুই ধারাতেই এই গল্প বেশ জনপ্রিয়। নবযানেও হয়তো উল্লেখ আছে।গল্পটি সেই সময়ের, যখন সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধ হননি। কৈশোরের সময়কালই হবে। সিদ্ধার্থকে সব সময়েই 'অহিংসা'-এর এক কান্ডারি হিসেবে উপস্থাপনা করা হয়। এবং সে কথা অসত্য নয়। তবে তিনি আমার কাছে সাম্যের প্রতীক।


ছোট থেকেই সিদ্ধার্থ আর চার পাঁচজনের থেকে আলাদা ছিলেন। হিংসার প্রতি তাঁর 'না' ছিল ঠিকই, কিন্তু ক্ষত্রিয় বংশে জন্মানোর কারণে যুদ্ধবিদ্যা ও অস্ত্রচালনার শিক্ষাও তিনি পেয়েছিলেন। বৌদ্ধ জীবনী ও ঐতিহ্যগত কাহিনিগুলিতে তাঁকে অস্ত্রবিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষ, এমনকি সমবয়সীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়েছে। ক্ষত্রিয়দের জন্য সেই শিক্ষা ছিল স্বাভাবিক।
সিদ্ধার্থর অন্য ভাইয়েরা (তুতো) বনে যেতেন শিকারে। কিন্তু সিদ্ধার্থের শিকারের প্রতি কোনও আগ্রহ ছিল না। এমনই একদিন সিদ্ধার্থ বসে আছেন, সেই সময়ে এক আহত এক রাজহংস সিদ্ধার্থের কোলে এসে পড়ে। রাজহাঁস তিরবিদ্ধ ছিল। সিদ্ধার্থ সেই তির বের করেন, এবং রাজহাঁসের ক্ষততে প্রলেপ লাগিয়ে দেন। যত্ন করে সারিয়ে তোলেন। এই সময়ে দেবদত্ত এসে উপস্থিত হন। দেবদত্ত ছিলেন সিদ্ধার্থের তুতো ভাই। দেবদত্ত এসে বলেন, এই রাজহাঁস তাঁর! কারণ তিনি এই রাজহংসকে শিকার করেছেন। তাই সেটির প্রতি তাঁর অধিকার সবচেয়ে বেশি। তখন সিদ্ধার্থ বলেন, এই রাজহাঁসকে তিনি দেবেন না। কারণ এটি তাঁর কোলে এসে পড়েছিল। তিনি রাজহাঁসটিকে সেবা করে সারিয়ে তুলেছেন বা প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাই রাজহাঁসটির প্রতি তাঁর অধিকার বেশি। তিনি রাজহাঁসকে কিছুতেই দেবদত্তকে দেবেন না, এবং রাজহংসকে মুক্ত করে দেবেন।
এরপর দুই ভাইয়ের মধ্যে তর্কবিতর্ক শুরু হয়। দুজনেই সেই সময়ে বালক। কয়েকটি জনপ্রিয় পুনর্কথনে এমনও বর্ণনা পাওয়া যায় যে, দেবদত্ত রাগ দেখিয়ে বলেন, তিনি এই রাজহাঁস ছিনিয়ে নিতে পারেন এবং তাঁর অধিকার বেশি! সিদ্ধার্থ তাঁর অধিকার ছিনিয়ে নিতে পারে না। উত্তরে গৌতম বলেন, দেবদত্ত ছিনিয়ে নিতে পারে কিনা দেখুক! যুদ্ধবিদ্যা তিনিও শিখেছেন, তিনি হিংসার প্রদর্শন করেন না মানে এই নয় যে তিনি দুর্বল! তবে এই নির্দিষ্ট কথোপকথনের ঐতিহাসিক বা প্রাচীন গ্রন্থগত প্রমাণ স্পষ্ট নয়; এটি মূলত লোকমুখে প্রচলিত কাহিনির অংশ হিসেবেই বেশি পরিচিত।
অবশেষে বিষয়টি শাক্যদের সভা বা বিচারপরিষদের সামনে উপস্থাপিত হয়। সেখানে রায় ছিল সিদ্ধার্থের পক্ষেই। যুক্তি ছিল, যে প্রাণ বাঁচাতে চায়, তার দাবি সেই প্রাণের ওপর বেশি; যে প্রাণ নিতে চায়, তার নয়। রাজহাঁসটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়।
এর অনেক বছর পর সিদ্ধার্থ বুদ্ধ হন। আমি জানি, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে তাঁকে স্মরণ করা যায়। তাঁর দর্শনকে মনে নিয়ে চলা যায়। তিনি প্রাসঙ্গিক, বিশেষত এই সাম্প্রতিক সময়ে। পক্ষ একটাই হয়, সেটা হলো দুর্বল এবং শোষিতের পক্ষ। যে প্রাণ নিতে বা হত্যা করতে চায়, বা যে শোষক তার অধিকার থাকে না, বরং প্রাণরক্ষাকারীদের অধিকার থাকে বেশি।

Comments